সাপের নাচ

Wednesday, August 20, 2008

দৈনিক সমকাল পত্রিকার ৯ আগস্ট ২০০৮ এ একটি খবর বের হয়েছে। সম্পূর্ণ খবরটি তুলে দিচ্ছি। লিংক

মুন্সীগঞ্জে খালের পানিতে সাপের যুগল নৃত্য!
সাপের নাচনাচ নাগিনী নাচ রে…
মামুনুর রশীদ খোকা, মুন্সীগঞ্জ

সাপুড়ের বীন বাজানোর মাধ্যমে খাঁচা থেকে বের করে আনা সাপের নাচ গ্রাম-গঞ্জে প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে সাপুড়ে নেই, নেই বীনের সুর। কেবল টলমলে খালের পানিতে সাপ দুটি নেচে নেচে বিনোদন দিচ্ছে শত শত দর্শনার্থীকে। গেল সপ্তাহের শনিবার বিকেলে চৌধুরীবাজার মঠের পাশের সাতানিখিল খালের পানিতে সর্পযুগলের নাচের অভূতপূর্ব দৃশ্য প্রথম চোখে পড়ে এলাকাবাসীর। সাপ দুটির নৃত্যশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে পড়েন সবাই। এতে সাপ দুটিকে মেরে ফেলার চিন্তাও মাথায় আসেনি কারো। বরং সাপের নৃত্যে মুগ্ধ-বিমোহিত সবাই। প্রতিদিন বিকেলে সাপ দুটি আসে এখানে, আর তালে তালে নেচে চলে ২, ৩ কিংবা ৪ ঘণ্টা একটানা।
সাপ নিয়ে অনেক ছায়াছবি তৈরি হয়েছে। হিন্দু ধর্মেও রয়েছে সাপকে নিয়ে নানা পৌরাণিক কাহিনী। আর মুন্সীগঞ্জের সাপের নাচ নিয়ে এখানে চলছে মাতামাতি। প্রতিদিন এখানে সাপের এই নৃত্যদৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে উল্লাসে ছুটে আসছে কিশোর, তরুণ-তরুণী, আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই। এ অঞ্চলের লোকজন বুধবার সর্বশেষ সাপ দুটির নাচের দৃশ্য দেখতে পেয়েছেন। তবে বৃহস্পতি ও গতকাল শুক্রবার সাপের নাচের এই দৃশ্য দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারা।
সাপ দুটি নেচে থাকে দিনে দু’তিনবার, ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মহাকালী ইউপি ভবনের পার্শবর্তী চৌধুরী বাজারের সুউচ্চ মঠের পাশ দিয়ে বয়ে চলা সাতানিখিল খালের পরিষ্কার টলমলে পানিতে। সাড়ে ৪ থেকে ৫ ফুট লম্বা কালো আর পেটের অংশে সাদা রঙের সাপ দুটির নাচের দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শীরা একে নাগ-নাগিনীর নাচন বলে অভিহিত করছেন।
এদিকে এলাকায় এই সাপ দুটি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নানা কল্পকাহিনী। কেউ কেউ বলছেন, এ দুটি আসলে দাঁড়াশ সাপ। আবার ধর্মপ্রাণ অনেক হিন্দু এগুলোকে সাপ বলতে নারাজ। তাদের চোখে এরা দুই সাক্ষাৎ দেবতা। এলাকার হারেশ শেখ সাপ দুটিকে আধ্যাত্মিক শক্তিধর কিছু মনে করছেন। আর এ অঞ্চলের নামকরা সাপুড়ে ডাবলু সাপ দুটিকে ধরতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি এখন আছেন ভয়ে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পানিতে নেমে সাপ ধরার পরপরই অন্য রূপ নিয়ে নিচ্ছে। তাই শত চেষ্টা করেও তালুবন্দি করতে পারিনি। আসলাম শেখ (৩৫) এখন ভয়ে জ্বরে ভুগছেন। এলাকাবাসীর মতে, এই স্থানটিতেই একদা হিন্দু জমিদার কেদার চৌধুরীর বাড়ি ছিল। মেয়ের জন্য প্রায় সাড়ে ৩ শ’ ফুট উচ্চতার মঠটি তৈরি করেছিলেন আড়াই শ’ বছর আগে। মঠের ঠিক ওপরে ছিল একটি কলসি। সেখানে অনেক ধনরত্ন রয়েছে বলে কথিত আছে। এছাড়া ওই মঠে হিন্দুরা পূজা-অর্চনা করতেন। মঠের ভেতর দুটি সাপ পুষতেন জমিদার কেদার চৌধুরী। সেখানে সাপ দুটিকে দুধকলা ভোগ দেওয়া হতো। পরে জমিদাররা এলাকা ছাড়লে মঠটির পাদদেশে বাজার গড়ে ওঠে, যা আজকের চৌধুরীবাজার। তবে আড়াই শ’ বছরের সেই মঠটি আজ অযত্নে আর অবহেলায় পড়ে আছে। মঠের চূড়ার সেই কলসিটি গত সিডরে ভেঙে গেছে।
অপরদিকে খালের পানিতে নৃত্যরত সাপ দুটিই মঠের সেই সাপ বলে মনে করছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। এমনকি মুসলমানরাও দুধকলা ভোগ দিচ্ছেন সাপ দুটিকে। গতকাল শুত্রক্রবার দুপুরে দাদি বুলবুল মুখার্জি ও নাতনি দোলা মুখার্জি সাপকে ভোগ ও পূজা দেওয়া শেষে সমকালকে বলেন, ‘এ দুটি সাপ নয়। এরা দেবতা। সাপের মুখোশ পরে দেবতা এসেছে এখানে।’
স্থানীয় মহাকালী ইউপি চেয়ারম্যান সোলামিয়া বেপারী বলেন, ‘সাপ খেলা করেছে এটা সত্যি। সবাই দেখেছে। আমিও সাপ নাচতে দেখেছি। তবে এটা ঘিরে যে কথা ছড়াচ্ছে তা মিথ্যে।’
অন্যদিকে এলাকার রফিক, মোস্তফা শেখের ভাই হাশেম শেখকে সাপ দুটি ভোগ দিতে বলেছে বলে সমকালকে তাদের পারিবারিক সূত্র জানায়। গায়েবি আওয়াজের মাধ্যমে ভোগ দেওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা।

আর পূর্বের ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়েছে আজকের সমকাল পত্রিকায়।

প্রজনন মৌসুমে অন্যকে আকর্ষণে গোখরার এই জলকেলি

শাহেদ চৌধুরী

মুন্সীগঞ্জে খালের পানিতে সাপের যুগল নৃত্য নিয়ে দেশজুড়ে নানা গল্প-গুঞ্জন, কল্পকাহিনী ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ সাপ দুটির নয়নাভিরাম নৃত্যশৈলীকে আধ্যাত্মিক শক্তিধর কিছু মনে করছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের কারো কারো দৃষ্টিতে সাপের মুখোশ পরে দেবতার আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু প্রাণি-বিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্নকথা। তাদের মতে, ওই সাপ দুটো গোখরা প্রজাতির। প্রজনন মৌসুমে মিলনের আগ মুহূর্তে একে অন্যের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় ও মোহনীয় করে তুলতে পানিতে যুগল নৃত্য করছে। আবার বিরক্ত হলেও নাচানাচি করতে পারে সর্পযুগল।
গত ক’দিন ধরে মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার মহাকালী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের পার্শ্ববর্তী চৌধুরীবাজার সংলগ্ন সুউচ্চ মঠের পাশ দিয়ে বয়ে চলা সাতানিখিল খালের পরিষ্কার টলমলে পানিতে সর্পযুগলের নাচের অভূতপূর্ব দৃশ্য অনেকের চোখে পড়েছে। এ নিয়ে শনিবার সমকালে একটি সচিত্র প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা চিড়িয়াখানার সাবেক কিউরেটর বর্তমানে রাজশাহী বিভাগীয় পশুসম্পদ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মফিজুর রহমান বলেছেন, ওই সাপ দুটো গোখরা প্রজাতির। আর মিলনের ঠিক আগের মুহূর্তে সাপ দুটো নৃত্যশৈলীতে মত্ত হয়েছে। নৃত্যের মধ্য দিয়ে পরস্পরকে আরো কাছে পেতে চাইছে।
একমাত্র গোখরা সাপই ফণা তুলে পানিতে নাচতে পারে। সাধারণত এ প্রজাতির সাপের পক্ষেই শরীরের তিন ভাগের এক ভাগ পানির উপরিভাগে উঠিয়ে মনোমুগ্ধকর নৃত্য করা সম্ভব। ফণা তোলার কারণে সাপ ভারসাম্য রাখতে পারে। সেই সঙ্গে মুগ্ধ-বিমোহিত নাচের অভূতপূর্ব দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতেও তারা সক্ষম।
মুন্সীগঞ্জে খালের পানিতে নৃত্যরত সাপ ফণা তুলেনি। তবে গোখরা সাপের মতো শরীরের আঁশ বাদামি এবং কালো রংয়ে মিশ্রিত। বুকের অংশ সাদা। পেছনের দিক বাদামি। পাঁচ থেকে ছয় ফুট লম্বা। দ্র“ত গতির এ সাপ সাঁতারে পটু। একই সঙ্গে বিষধর। এ সাপের ছোবলে প্রাণহানির আশঙ্কাও আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, সাধারণত জুন-জুলাই মাস গোখরা সাপের প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে সঙ্গীর মনোরঞ্জন কিংবা দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সাপ জলকেলিতে মেতে ওঠে। একেকটি সাপ বছরে একবার গড়পড়তা ৬০ থেকে ৭০টি ডিম দিয়ে থাকে।
গোখরা সাপ দু’প্রজাতির। পদ্ম ও খৈয়া। সাধারণত লোকালয়ের বাইরে খানিকটা শুকনো, খানিকটা ভেজা জায়গায় এদের আবাস। নদী কিংবা জলাধারের পাশে জঙ্গলে অথবা ইঁদুরের গর্তে এরা থাকে। টিকটিকি, ইঁদুর, পোকামাকড় ও পশুপাখির ডিম খায়। মাছে আগ্রহ নেই। গাছে উঠতে বেশ পারঙ্গম। সুন্দরবনে সংখ্যাধিক্য বেশি।
প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাপ নিয়ে নানা পৌরাণিক কাহিনী থাকলেও মুন্সীগঞ্জ খালের নৃত্যরত সাপ নিয়ে বাড়াবাড়ির কোনো সুযোগ নেই। ওই সাপে আধ্যাত্মিক শক্তিধর কিছু নেই। সাপকে দুধকলা ভোগ দিয়েও লাভ নেই। কেননা সাপ কখনই দুধকলা খেতে পারে না।

এ থেকে বোঝা যায়, বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের মধ্যে কোনটা বেশি গ্রহণযোগ্য।

প্রথম প্রকাশ: আমারব্লগ.কম

0 comments:

Post a Comment

পদচিহ্ন

Blog Archive

মুক্তমনা বাংলা ব্লগ

  © Dristipat

Back to TOP